বাংলাদেশে NEIR চালু, আপনার মোবাইল ফোন বৈধ কি না জানবেন যেভাবে

আজ থেকে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে NEIR কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্কে নতুন করে যুক্ত হওয়া অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে বন্ধ করার প্রক্রিয়া চালু হলো। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে অবৈধ বা গ্রে মার্কেটের মোবাইল ফোন নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। NEIR চালুর ফলে সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সবাই জানতে চাইছেন—NEIR আসলে কী, এটি কেন চালু হলো এবং এর প্রভাব কী হবে। অনেকেই আবার নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বৈধ কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

NEIR কী এবং কেন চালু হলো

NEIR এর পূর্ণ নাম ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার। এটি একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসভিত্তিক সিস্টেম, যেখানে দেশের সব বৈধ মোবাইল ফোনের IMEI নম্বর সংরক্ষিত থাকে। প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি আলাদা IMEI নম্বর থাকে, যা সেই ডিভাইসের পরিচয় হিসেবে কাজ করে। NEIR চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন ব্যবহার বন্ধ করা, চুরি হওয়া ফোন পুনরায় নেটওয়ার্কে ব্যবহার রোধ করা এবং মোবাইল বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। এতদিন অবৈধ ফোন ব্যবহারের কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছিল, আবার গ্রাহকরাও প্রতারণার শিকার হচ্ছিলেন। NEIR এই সমস্যা সমাধানের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যবহৃত ফোন কি বন্ধ হয়ে যাবে

NEIR চালু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হলো বর্তমানে ব্যবহৃত ফোন বন্ধ হয়ে যাবে কি না। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে, এখন নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোনো ফোন এই মুহূর্তে বন্ধ করা হবে না। ফোনটি বৈধ হোক বা অবৈধ, সেটি যদি আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে হঠাৎ করে সেটি অচল হয়ে যাবে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা অবিক্রীত ফোন, যেগুলোর IMEI তথ্য আগেই জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও আপাতত বন্ধ হবে না। NEIR মূলত ভবিষ্যতে নতুন করে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে বন্ধ করার জন্য কার্যকর হবে। তাই সাধারণ ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আপনার মোবাইল ফোন বৈধ কি না জানবেন যেভাবে

NEIR চালুর পর ফোনের বৈধতা যাচাই করা এখন অনেক সহজ হয়েছে। সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এই যাচাইয়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বাধ্যতামূলক নয়। যে কেউ ঘরে বসেই কয়েকটি ধাপে নিজের ফোনের অবস্থা জানতে পারবেন।

ডায়াল কোড ব্যবহার করে যাচাই

এই পদ্ধতিটি সবচেয়ে সহজ এবং দ্রুত।

ধাপ ১: মোবাইল ফোন থেকে *16161# ডায়াল করুন
ধাপ ২: স্ক্রিনে দেখানো ঘরে ফোনের ১৫ সংখ্যার IMEI নম্বর লিখুন
ধাপ ৩: কিছুক্ষণের মধ্যেই এসএমএসে জানিয়ে দেওয়া হবে ফোনটি বৈধভাবে নিবন্ধিত কি না

SMS এর মাধ্যমে যাচাই করার নিয়ম

ডায়াল কোড ব্যবহার করতে না চাইলে এসএমএসের মাধ্যমেও যাচাই করা যাবে।

ধাপ ১: মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন: KYD <space> ১৫ সংখ্যার IMEI
ধাপ ২: মেসেজটি পাঠান 16002 নম্বরে
ধাপ ৩: ফিরতি এসএমএসে ফোনটির নিবন্ধন অবস্থা জানানো হবে

এই দুই পদ্ধতিই সহজ, দ্রুত এবং সবার জন্য উন্মুক্ত।

অনলাইন ও কাস্টমার কেয়ার থেকেও যাচাই

যারা অনলাইন সুবিধা নিতে চান, তারা neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে সিটিজেন পোর্টালে প্রবেশ করে ফোনের বৈধতা যাচাই করতে পারবেন। এছাড়াও যেকোনো মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে গিয়ে IMEI নম্বর দেখিয়ে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। এতে করে প্রযুক্তি সম্পর্কে কম ধারণা থাকা গ্রাহকরাও সহজে সেবা নিতে পারবেন।

NEIR কীভাবে কাজ করে

কারিগরি দিক থেকে NEIR মূলত তিনটি তথ্যের সমন্বয়ে কাজ করে। এগুলো হলো IMEI নম্বর, সিম নম্বর এবং IMSI। এই তিনটি তথ্য মিলিয়ে নেটওয়ার্ক সিদ্ধান্ত নেয় কোনো ফোন সচল থাকবে কি না। তবে NEIR কোনোভাবেই ব্যবহারকারীর কল রেকর্ড, মেসেজ বা ইন্টারনেট ব্যবহারের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে না। এটি শুধু ডিভাইস শনাক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

ব্যবসায়ীদের আপত্তি ও উদ্বেগ

NEIR চালুর আগে অবৈধ ফোন বন্ধের ঘোষণার প্রতিবাদে একাধিকবার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করেছেন। তাদের দাবি ছিল, হঠাৎ করে এই ব্যবস্থা চালু হলে বাজারে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। অনেক ব্যবসায়ীর কাছে আগে থেকেই আমদানি করা ফোন মজুত ছিল। এই পরিস্থিতিতে সরকার কিছু সময় দেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত আজ থেকেই NEIR কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

NEIR নিয়ে গোপনীয়তার প্রশ্ন

যেহেতু NEIR একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস, তাই ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিস্টেম নজরদারির জন্য তৈরি নয়। তবে তথ্য সুরক্ষায় দুর্বলতা থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ডাটা সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিকভাবে NEIR ধরনের ব্যবস্থা

বাংলাদেশ একা নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই একই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে চুরি হওয়া ফোন বন্ধ এবং অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে NEIR মোবাইল খাতে শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে NEIR এর প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, NEIR চালুর ফলে ডিজিটাল অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। অবৈধ ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে নানা ধরনের জালিয়াতি ও অপরাধ সংঘটিত হয়। NEIR সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমাবে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরা সুরক্ষা পাবেন এবং সরকার রাজস্ব আদায়ে উপকৃত হবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে আইনি কাঠামো ও কার্যকর তদারকির ওপর।

প্রশ্ন–উত্তর (FAQ)

NEIR কি আমার ব্যক্তিগত তথ্য নজরদারি করবে

না, NEIR কল, মেসেজ বা ইন্টারনেট ব্যবহারের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে না।

পুরোনো ফোন ব্যবহার করলে সমস্যা হবে কি

না, বর্তমানে ব্যবহৃত ফোন বন্ধ করা হবে না।

নতুন ফোন কেনার সময় কী সতর্কতা প্রয়োজন

ফোনটি বৈধভাবে আমদানি ও নিবন্ধিত কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

শেষ কথা

সব মিলিয়ে বলা যায়, NEIR চালু হওয়া বাংলাদেশের মোবাইল খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে অবৈধ ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, চুরি হওয়া ফোন বন্ধ এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের অধিকার ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক বাস্তবায়ন হলে NEIR সাধারণ ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে।

আরও জানতে পারেনঃ কবে পাচ্ছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন

Leave a Comment