বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ রচনা ২০ পয়েন্ট

<<<<বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ রচনা ২০ পয়েন্ট>>>>>

ভূমিকা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রায় প্রতিবছর কোনা না কোনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত সংবেদনশীলতার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি নিয়মিত ও প্রত্যাশিত ঘটনা যা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে বারবার মন্থর করে দেয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ: সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

যেসব ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে ব্যাহত করে, মানুষের সম্পদ ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে এবং যার জন্য আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হয় তাদের দুর্যোগ বলে। আর প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট দুর্যোগকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাধারণত আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক হয়, যার ফলে জীবন-জীবিকা, অবকাঠামো ও পরিবেশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশের অবস্থান ও দুর্যোগপ্রবণতা

হিমালয় ও ভারত থেকে নেমে আসা ৫৪টি নদী, বিশাল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার প্রবাহের সাথে মিশে শত শত নদী বয়ে গেছে এদেশের ওপর দিয়ে। নদী মিশেছে সাগরে। মূলত নদীবাহিত পলিমাটিতে তৈরি একটি বদ্বীপ এই বাংলাদেশ। এর সঙ্গে মিলেছে বঙ্গোপসাগর থেকে ওঠা উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্বীপসমূহ। বাংলাদেশের দক্ষিণাংশ জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর।

ভৌগোলিক এই বৈশিষ্ট্যই বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ করে তুলেছে। সমুদ্রে ঝড় উঠলে তা প্রবল বেগে ধেয়ে আসে উপকূলে। সঙ্গে ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস ৮-১০ ফুট উঁচু হয়ে আছড়ে পড়ে, মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উপকূলীয় অঞ্চলের বাড়িঘর, মানুষ, গবাদিপশু ও ফসল। ব্যাপক ক্ষতি হয়, ভেঙে পড়ে গাছপালা। ঐসব অঞ্চল পরিণত হয় এক বীভৎস মৃত্যুপুরীতে। যারা বেঁচে থাকে তাদের হাহাকারে আর স্বজন হারানোের বেদনায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। সর্বস্ব হারানো নিঃস্ব মানুষগুলোর বেঁচে থাকাই যেন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণসমূহ

বৈশ্বিক কারণ

পরিবেশ দূষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর বহু দেশে সৃষ্টি হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। শতকরা ২০-২৫ ভাগ জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে, তবে বেশিরভাগ পরিবর্তন হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলো। এদের অতি ভোগবিলাসিতা ও যন্ত্রনির্ভরশীলতার জন্য পৃথিবীতে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা ও গাড়ি থেকে অতিমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের ফলে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তাপমাত্রা, তাতে মেরু অঞ্চল ও বিভিন্ন পর্বতে জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র ও নদীর কম্পন বাড়ছে, ফলে নদী ও সমুদ্রের উপকূলে ভাঙনের হারও বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশীয় কারণ

জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। পলি জমে বেশকিছু নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। দেশের প্রধান নদীগুলো বিভিন্ন স্থানে এসে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মাধ্যমে হিমালয় থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানি এলেও এগুলোর স্রোতধারা অনেকটা কমে গেছে।

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে গত তিন দশকে বাংলাদেশের ৮০টি নদীর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এক সময়ের খরস্রোতা নদী হিসেবে পরিচিত দেশের ১৭টি নদী মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। আরও ৮টি নদী মৃতপ্রায়। এসব নদী ড্রেজিং করে সচল করারও কোনা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে বর্ষাকালে নদীর উপচে পড়া পানি প্লাবিত করে ফসলের মাঠ, জনবসতি।

বন উজাড় করাও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরেকটি কারণ। প্রত্যেক দেশের মোট আয়তনের ২৫% বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন সেখানে বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মাত্র ১৬% ভাগ বনাঞ্চল রয়েছে, বেসরকারি হিসাবে যা ৯-১০%। বনভূমির এই স্বল্পতা পরিবেশের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ

নদ-নদী, বন-বনানী, এল নিনো ও লা নিনার (প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে ঘটে যাওয়া এনসো চক্রের দুটি বিপরীত অবস্থা) প্রভাবে এদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিনিয়ত হানা দেয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, ঝড়-ঝঞ্ঝা, খরা, নদী ভাঙন, ভূমিকম্প, লবণাক্ততা ইত্যাদি।

বন্যা

প্লাবন বা বর্ষার ভয়াল রূপ হলো বন্যা। বন্যার করাল গ্রাসে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ ও গৃহপালিত পশু প্রাণ হারায়, ঘর-বাড়ি ও কৃষিফসল বিনষ্ট হয়। বিগত চার দশক থেকে বন্যা বাংলাদেশের একটি বার্ষিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

১৯৪৫ ও ১৯৫৫ সালের বন্যা মানুষের মনে এখনও বিভীষিকারূপে বিরাজ করছে। ১৯৬৪ সালের বন্যায় সারা দেশ প্লাবিত হয়েছিল। ১৯৭০ সালেও দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭৪ ও ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালের বন্যাও ছিল ভয়াবহ। এসব বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানিসহ ফসল ও সম্পদের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়। শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় ১৯৯৮ সালে। এ দীর্ঘস্থায়ী মহাপ্লাবনে দেশের বহু ক্ষেতের ফসল, ঘর-বাড়ি ও মূল্যবান সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ২০০৪ সালের বন্যা। এ বন্যায় দেশের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।

সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস

সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ দুর্যোগ প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশে কম-বেশি আঘাত হানে। বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ১৯৭০, ১৯৯১, ২০০৭ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস ছিল খুবই ভয়াবহ।

এসব সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসে ১৯৭০ সালে প্রায় ৫ লাখ, ১৯৯১ সালে প্রায় দেড় লাখ এবং ২০০৭ সালে প্রায় লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে। আশ্রয়চ্যুত হয় লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ। এ সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সবকিছু। ফলে মানুষ পতিত হয় অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায়।

ঝড়-ঝঞ্ঝা

গ্রীষ্মকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আমাদের দেশে প্রতি বছরই অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা সংঘটিত হয়ে থাকে। এসব ঝড় সাধারণত বৈশাখ ও আশ্বিন মাসে হয়। ঝড়ের তাণ্ডব নৃত্যে এদেশের প্রচুর ঘর-বাড়ি এবং খেতের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। যদিও এগুলো ছোট মাপের দুর্যোগ, তবুও স্থানীয়ভাবে এগুলোর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।

অনাবৃষ্টি বা খরা

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রকৃতির হেয়ালিপনার শিকার এদেশ প্রায় প্রতি বছরই অনাবৃষ্টি বা খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পতিত হয়।

খরার প্রচণ্ড তাপদাহে মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সংঘটিত খরার প্রকোপে ব্যাপক ফসলাদিসহ জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। খরার হিংস্র থাবার ফলে দেখা দেয় খাদ্যাভাব ও বিভিন্ন রোগ-শোক। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে খরার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

নদী ভাঙন

নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে গেছে হাজারো ছোটো-বড়ো নদী। নদীর ধর্মই হলো—এপাড় ভেঙে ওপাড় গড়া। কিন্তু নদীর এ সর্বনাশা ভাঙন এক মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছরই এদেশের প্রচুর সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ দুর্যোগের কবলে পড়ে এদেশের বহু লোককে তাদের ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করতে হয়। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও তিস্তা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে নদীভাঙনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

ভূমিকম্প

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক ভয়াবহ রূপ হলো ভূমিকম্প। বিভিন্ন কারণে এদেশে মাঝে মাঝে ছোটো-বড়ো ভূমিকম্প আঘাত হানে। তবে অন্যান্য বছরের মতো ভূমিকম্প আঘাত হানলেও ২০১৫ সালের ভূমিকম্প ছিল ভয়ানক। একই সালে কয়েকবার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে বিভিন্ন এলাকায় দালানকোঠা ধসে যাওয়াসহ নানা ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

যদি ভূমিকম্পের মাত্রা বাড়ে তাহলে বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট ভেঙে পড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ জানমালের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ভূ-তাত্ত্বিকরা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার আওতাভুক্ত। বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা এটিকে ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।

লবণাক্ততা

সমুদ্র তীরবর্তী এদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো লবণাক্ততা। সমুদ্রের লবণাক্ত পানির প্রভাবে এদেশের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল লবণাক্ত থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে অনেক এলাকায় কোনা ফসল উৎপাদিত হয় না, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের উপায় বা দুর্যোগ মোকাবিলা করার উপায়

বিশ্বের সকল বিজ্ঞানীই একমত যে, জলবায়ু দূষণের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। জলবায়ু দূষণের ক্ষেত্রে পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলােই বেশি দায়ী। বাংলাদেশসহ দরিদ্র দেশগুলোর দায় অনেক কম, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। কাজেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে বা একে মোকাবিলা করতে হলে সারা বিশ্বকেই একযোগে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলো রক্ষার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলােকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সাহায্য দিতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য নিম্নোক্ত উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে:

বৈশ্বিক উদ্যোগ

১. পৃথিবীর সব দেশ বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো যদি সমঝোতার মাধ্যমে অন্তত ১০-১৫ বছর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে তাহলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। প্যারিস চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।

২. গ্রিনহাউস গ্যাস কমাতে হলে জ্বালানি পোড়ানো কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।

৩. উন্নয়ন বান্ধব কার্বন কনটেন্ট তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কার্বন নিঃসরণ কমানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

জাতীয় উদ্যোগ

৪. জলবায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে শিল্পকারখানার মালিক ও জনগণকে সচেতন করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশ শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অপরিহার্য অংশ করতে হবে।

৫. কলকারখানার বর্জ্য ও শহরের মল-মূত্র এবং আবর্জনা সরাসরি নদীতে না ফেলে পরিশোধন করে ফেলতে হবে। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কঠোর নীতি প্রয়োগ করতে হবে।

৬. বায়ু দূষণ রোধকল্পে প্রতিটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনাঞ্চল থাকা একান্ত আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৬% বলা হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে আছে ৯% থেকে ১০%। সুতরাং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য ব্যাপকভাবে বনায়ন করতে হবে। বনভূমি উজাড়করণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে।

৭. পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে বনাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. কৃষি জমি, জলাভূমি, পাহাড় ইত্যাদি ধ্বংস করে বসতবাড়ি বা কলকারখানা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় পরিবেশগত দিকগুলো বিবেচনায় আনতে হবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন

৯. দেশের ছোটো-বড়ো সকল নদীকে পর্যায়ক্রমে ড্রেজিং করে নাব্যতা বাড়াতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

১০. যে নদী মরে গেছে বা যাচ্ছে সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ড্রেজিং করে নাব্যতা বাড়াতে হবে। নদী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

১১. সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে এবং বাঁধের ওপর ও আশপাশে ব্যাপক বনায়ন করে সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পেতে অনেকটা প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।

১২. সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ জায়গা বা বহুতল বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ জোরদার করতে হবে।

প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ

১৩. দুর্যোগ ঘটার পূর্বে জনগণকে সতর্ক করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে।

১৪. দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীবাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কাজে এবং স্থাপনা নির্মাণে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাহায্য নিতে হবে।

১৫. স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন সংস্থা, বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী দল, এমনকি সর্বস্তরের মানুষ তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকে।

এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে—খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (UNICEF), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP), বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি (WFP), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংক্রান্ত হাইকমিশনারের দপ্তর (UNHCR)। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের প্রায় দুশ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন কাজে জাতিসংঘকে সহযোগিতা করে থাকে।

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ব্র্যাক, আশা, প্রভৃতি বেসরকারি সংস্থা দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও আর্মি, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী দুর্যোগকালীন সময়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে নিয়োজিত থাকে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাবলি

দুর্যোগ মানব জীবনে বয়ে আনে অবর্ণনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা। দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতিতে দেশের অবকাঠামো নড়বড়ে হয়ে যায়, অচল হয়ে যায় দেশের অর্থনীতির চাকা। তাই বাংলাদেশেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় ভিত্তিতে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে।

১৯৯৫ সালে একটি জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কার্য পরিকল্পনা (NEMAP) গৃহীত হয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছে যা দুর্যোগ পূর্ববর্তী প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন কাজে নিয়োজিত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছেও সরকার প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা চেয়েছেন। বিশেষ করে ১৯৮৭, ৮৮ ও ৯৮’র বন্যা ‘৯১-এর ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭-এর জলোচ্ছ্বাসে দুর্গতের জন্য বাংলাদেশের আহ্বানে ব্যাপক আকারে বৈদেশিক সাহায্য এসেছে।

সরকার উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, নদী বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, কমিউনিটি ভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে এসব পদক্ষেপের বাস্তবায়নে আরও জোরদার পদক্ষেপ প্রয়োজন।

উপসংহার

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেকোনা দেশের মানুষের জন্য অভিশাপস্বরূপ। এটি কেবলই অনাকাক্ষিত ও অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয় জনজীবনকে। বাংলাদেশের মতো একটি সমতল ভূমিতে অবিরত দুর্যোগ সংঘটিত হয়ে এদেশের জাতীয় অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে, রুদ্ধ করছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা।

এ দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে মানুষের কোনা হাত না থাকলেও সরকার এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এর মোকাবিলা করার প্রয়াস চালাতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে দুর্যোগ পূর্ববর্তী প্রস্তুতি ও দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসনের উপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ, যেখানে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহিষ্ণু উন্নয়ন একসাথে বিবেচিত হবে।

আরও জানতে পারেনঃ আর্টস এর সাবজেক্ট কি কি | Arts subject list

Leave a Comment